আপনি চিনি কিনছেন? বাড়িতে শিশু আছে? শিশু থাকলে তার বয়স কত? চিনি শুধু বয়স্ক বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সমস্যা নয়, বাড়তি চিনি ছোটদের জন্যও বিপজ্জনক। আর এটি কথার কথা নয়। বিপদের বিষয়টি এসেছে গবেষণায়।
শিশুর জীবনের প্রথম ১ হাজার দিন; অর্থাৎ পৌনে তিন বছর চিনি বেশি খেল কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই বয়সে বেশি চিনি গ্রহণ প্রাপ্ত বয়সে এসে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শিশু বয়সে বেশি চিনি গ্রহণ করলে তা মস্তিষ্কের বিকাশ প্রভাবিত করতে পারে। মস্তিষ্কের ১১টি জায়গায় চিনির কারণে পার্থক্য তৈরি হতে দেখেছেন গবেষকেরা।
এটি নতুন ধরনের গবেষণা। যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে গবেষণাটি করেছেন। গত আগস্টে এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন, শৈশবে চিনির সংস্পর্শ থাকা একজন ব্যক্তির প্রাপ্ত বয়সে মানসিক স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও স্নায়ুর বিকাশ প্রভাবিত করে কি না। তাঁরা গবেষণায় দেখেছেন, গর্ভকালীন অবস্থায় এবং জীবনের প্রথম দুই বছর অতিরিক্ত চিনির সংস্পর্শে আসেনি, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগের ঝুঁকি কম। আর শিশুকালে বেশি চিনি গ্রহণকারীদের মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা প্রাপ্ত বয়সে এসে উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণার পদ্ধতি
গবেষক দলটি যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংকের থাকা ৪৬ হাজার ৪৪৮ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসের উপাত্ত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেন। এসব মানুষ ১৯৫১ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৫৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। সময়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ওই সময় যুক্তরাজ্যে খাদ্যে কঠোর রেশনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। রেশনব্যবস্থা ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা ১৫ দশমিক ৭ বছর ধরে কাজটি করেছেন।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা মানুষকে রেশনব্যবস্থার আওতায় থাকার মেয়াদ অনুযায়ী কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়। যেমন কেবল গর্ভকালের ২৭০ দিন, গর্ভকাল থেকে পরবর্তী ১ হাজার দিন এবং রেশনব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষ। রেশনের আওতায় থাকা মানুষ চিনি পেতেন সীমিত পরিমাণে।
গবেষণায় কী দেখা গেছে
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা জীবনের প্রথম ১ হাজার দিন চিনির বিধিনিষেধ বা রেশনের মধ্যে কাটিয়েছেন, তাঁদের প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে উদ্বেগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ কম। পাশাপাশি তাঁদের বিষণ্নতার ঝুঁকিও ২৯ শতাংশ কম ছিল। জীবনের প্রথম ৬৩৫ দিন বা ৮১৭ দিন কম চিনি গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের ঝুঁকি ধারাবাহিকভাবে কম দেখা গেছে।
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শৈশবে চিনির সংস্পর্শে আসার প্রভাবটি স্থায়ী হয়ে যায়। পরবর্তী জীবনে চিনি গ্রহণের পরিমাণ কমালে কিংবা জীবনযাত্রায় সমন্বয় করলেও উদ্বেগের ক্ষেত্রে প্রভাবটি অবিচল ও স্পষ্ট থাকে। তবে বিষণ্নতার ক্ষেত্রে এই প্রভাব পরবর্তী জীবনের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে কিছুটা পরিবর্তিত হয়।
শৈশবে চিনির সংস্পর্শ মস্তিষ্কের গঠনে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটায়। গবেষকেরা প্রায় ৬ হাজার অংশগ্রহণকারীর মস্তিষ্কের এমআরআই ফলাফল পর্যালোচনা করেন। মস্তিষ্কের ৮০টি অঞ্চলে ধূসর পদার্থের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পান তাঁরা। এর মধ্যে ১১টি অঞ্চলে (বিশেষ করে সেরিবেলাম ও ব্রেনস্টেমের অংশ) কম চিনি গ্রহণকারী ও স্বাভাবিক চিনি গ্রহণকারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। এই গঠনগত পরিবর্তন মানসিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষকেরা দেখেছেন, শৈশবে দীর্ঘ সময় চিনি থেকে দূরে থাকা ব্যক্তিরা প্রাপ্ত বয়সে মিষ্টি খাবারের প্রতি কিছুটা কম আসক্তি দেখিয়েছেন।
তাৎপর্য কী
গবেষকেরা বলছেন, শিশুদেহের বিকাশের সংবেদনশীল সময়ে পুষ্টির পরিবেশ কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের (যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ) ওপরই প্রভাব ফেলে না, বরং মস্তিষ্কের নিউরো-ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শিশুদের খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয়ের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই বাস্তবতায় জীবনের প্রথম ১ হাজার দিনে চিনির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণার ফলাফলকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের শিশু স্নায়ুরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদিপ্ত কুমার মুখার্জী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, চিনি শিশুদের মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা প্রাপ্ত বয়সে উদ্বেগ সৃষ্টির কারণ। শিশুদের নিয়ন্ত্রিত চিনি খাওয়ানো উচিত। সাধারণ অভিভাবকদের পাশাপাশি বিষয়টি জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
কমেন্ট বক্স